অশোক মজুমদারঃ শরীর খারাপের জন্য বেশ কয়েকদিন কোনো পোস্ট করতে পারিনি। দিল্লী সফরের কোনো অভিজ্ঞতাই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়নি। এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আজ তাই ডায়েরী আকারে দিল্লীর সফরনামা লিখলাম। অনেকটাই বড়ো হয়ে গেছে, আপনারা একটু সময় নিয়ে কষ্ট করে পড়বেন। 

২৫  জুলাই :                  

                       এইদিন বিকেলেই দিল্লী চলে যাই। নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। কারণ এবারে দিল্লী সফরের গুরুত্ব অপরিসীম। ২৬শে জুলাই দিদি পৌঁছাবেন। নেমেই ১৮৩ সাউথ এভেনিউ। দিদি এখানেই ওঠেন। অভিষেকের বাড়ি। ঠিক তার পাশের বাড়িটা ১৮১ মুকুল রায়ের। গিয়ে দেখি নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এমপিদের সাথে যোগাযোগের সময় একজন সাংসদ হেসে বলছিলেন, ১৮১ বাড়িটা কতবার হোডিং পরিবর্তন হবে!!                     

                          ভাবলাম সত্যিই তো। কিছুদিন আগেও মোদী অমিত শাহকে নিয়ে মুকুলদার ছবি দেখছিলাম এখানে!! যাইহোক বেশ কিছু ছবি তুলে পৌঁছে গেলাম বঙ্গভবনে ১০১ নং রুমে। দিল্লি এলেই আমার জন্য বরাদ্দ, এই রুমটা আমার খুব পছন্দের।

২৬ জুলাই :

                   মর্নিং ওয়াক করতে করতে ইন্ডিয়া গেট পৌঁছে গেলাম। যেতে যেতে দেখছিলাম মোদি সরকারের সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রোজেক্টের জন্য অনেক হেরিটেজ রাস্তা বিল্ডিং ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এই নিয়ে রাজনৈতিক এবং সাধারণ মানুষেরা প্রতিবাদ করছেন। ভাঙাচোরার জন্য আমি রাস্তা গুলিয়ে ইন্ডিয়া গেট পৌঁছে আবার বঙ্গভবনে গেলাম। এই রাস্তাটা আপ-ডাউন করলেই ৬ কিলোমিটার।                  

                      দুপুর ৩টের ভেতরেই দিল্লী এয়ারপোর্ট পৌঁছে যাই। দেখলাম দিল্লি সহ দেশের সব মিডিয়ার লোকজন হাজির। বিকেল ৫ টায় দিদি নেমে বেরিয়ে এলেন। সাংবাদিকদের প্রচন্ড হুড়োহুড়ি।” দিদি, দিদি” ডাকা থেকে “কুছ বলিয়ে” এই সবকিছু।                    

                     বুঝতে পারলাম, এবার দিল্লী দিদিকে নিয়ে মাতামাতি করবে। সবাইকে নমস্কার ও হাত নাড়িয়ে, কিছু না বলে দিদি গাড়িতে উঠলেন।

                      কনভয়ে আমার পঞ্চম নম্বর গাড়ি। একটু এগোতেই খেয়াল করলাম, সাউথ এ্যাভেনিউ পর্যন্ত দিদি আসবে বলে ট্রাফিক আগে থেকেই অনেক কন্ট্রোল করে রাখা আছে, যানজট নেই। সঙ্গী  সাংবাদিক বিশ্ব মজুমদারও তা লক্ষ্য করে বলছিল। দুজনেই বহুদিন ধরে দিদির সাথে দিল্লি আসা যাওয়া করছি। ট্রাফিক এত স্মুদ এই প্রথম দেখলাম। 

                      সাউথ অ্যাভেনিউ পৌঁছে ভেজ পকোড়া আর চা খাওয়ার ভেতরে বিশিষ্ট সাংবাদিক বিনীত নারায়ন দেখা করতে এলেন। ইনি সেই সাংবাদিক, যিনি প্রথম হাওয়ালা কেলেঙ্কারির খবর করেছিলেন। যা দেশ বিদেশ তোলপাড় করেছিল।

২৭ জুলাই:                 

                    সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। সকালে অল্প বৃষ্টির ভেতরই ছাতা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। এবার কাছাকাছি অন্য রাস্তা। মোবাইলে ১০টা বাজতেই বঙ্গভবনে ফিরতে গিয়ে চাতালে স্লিপ করে পড়ে গেলাম। ডান হাঁটু ও কপালে চোট পেলাম। কাছাকাছি সব সিকিউরিটি ছুটে এলো। খুব ভয় পেয়েছিলাম। ওরাই ধরাধরি করে উঠিয়ে দিলো। হাঁটুতে সামান্য ব্যথা এবং বাঁদিকের কপালে ব্যথা ছাড়া আর কিছুই তখন ছিলোনা।               

                       তাড়াতাড়ি সাউথ এভিনিউ পৌঁছে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে দেখলাম পা ভাঁজ করতে পারছিনা। কোনরকমে খুঁড়িয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। একটু পরেই কমলনাথ এলেন। তারপর আনন্দ শর্মা। কাউকে কিছু বুঝতে না দিলেও কিন্তু বেশ টের পাচ্ছি পায়ের ব্যাথাটা। 

                    

                     ওঁরা বেরিয়ে যাবার পর একটু পা টেনে হাঁটতে গিয়ে দেখি,পা সোজা করতে পারছিনা। পুলিশ জার্নালিস্ট সবাই জানতে চাইল কি হয়েছে ? “ও কিছু না বলে” বরফ দিয়ে ঘষাঘষি ছাড়া কি করবো বুঝতে পারছিনা।

                      এরপরই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। পায়ের ব্যথাটা ক্রমশ বাড়ছে। আমি তো ভিতরে ভিতরে নিজের উপরই বিরক্ত হচ্ছি। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। এসময়ই পায়ে লাগতে হলো।

                   এদিকে সাউথ এভিনিউয়ে আমায় দেখে দিদির কড়া নির্দেশ,”প্রধানমন্ত্রীর ছবি তুলতে তুই যাবি না।” আমি যথারীতি মাথা নাড়লাম। কিন্তু ছবি তো খুব দরকার। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত চিত্রসাংবাদিক ললিতের সাথে যোগাযোগ করলাম। ললিত আমার পূর্বপরিচিত। “দাদা কুছ চিন্তা নেহি। হাম মেল কর দেঙ্গে।” – ললিতই আমাকে প্রথম ছবি পাঠায়। তখনো প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক চলছে। পরে সে ছবি পিটিআই এর মাধ্যমে রিলিজ হয়।

                   

                  মিটিং শেষে বৃষ্টির ভিতর সোজা সাউথ এ্যাভেনিউ ফিরলাম। ছাতা মাথায় দিদি প্রেসের সাথে কথা বললেন। বাংলার দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যা যা বলেছেন, তা সাংবাদিকদের জানালেন।

                       অনেক প্রশ্নের ভেতরে এক সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, “দিদি আপনি জেতার পর প্রধানমন্ত্রী কোন শুভেচ্ছা জানাইনি। আজকে কি প্রধানমন্ত্রী সেই নিয়ে কিছু বলেছেন?”

                       “দিদি বললেন, না। এসব নিয়ে এতদিন পর কথা হবে কেন? এ প্রশ্ন আসবেই বা কেন? আমি তো আমার দাবীগুলো ওনাকে বুঝিয়ে বললাম। বাংলার মানুষ আমার সাথে আছে।”

                  

                      সন্ধ্যায় অভিষেক মনু সিংভি, পিকে, অভিষেক একসাথে বৈঠকে বসলেন। আমিও খোঁড়াতে খোঁড়াতে বঙ্গভবনে গেলাম।

                      পায়ের ওই অবস্থা দেখে কলকাতা থেকে আসা সাংবাদিক দেবদীপ, কিংশুক, রাজাময়, বিশ্ব নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করলো, ২৮ শের সকালে ডাক্তার দেখাতেই হবে। এক্সরে মাস্ট। এভাবে কাজ করলে তোমার ক্ষতি হবে বলে বারবার সাবধান করলো সাংবাদিক বন্ধুরা।

২৮ জুলাই:-

                     

                          দেবদীপ, রাজাময়ের সহায়তায় মেট্রো হাসপাতালে পৌঁছলাম। এক্সরে করা হলো। ডাক্তার দলিত সাগর এক্সরে দেখে বললেন, “টানা ১০দিন রেস্ট। পা নাড়ানো চলবে না। কিছু ওষুধ দিলেন খেতে। তার সাথে ব্যথায় লাগানোর জন্য মলম। কিংশুক আবার সব রিপোর্ট নিয়ে সল্টলেকে ডাক্তার কুনাল সেনগুপ্তের কাছে হোয়াটসঅ্যাপ করে দিল। উনিও ফোনে একই কথা বললেন।

                         

                   ফিরে এলাম মাথায় চিন্তা নিয়ে। ২৮,২৯,৩০ এখনো তিনদিন থাকতে হবে। তার মধ্যে এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সত্যিই পারবো তো এভাবে কাজগুলো করতে! সবচেয়ে অসুবিধা হচ্ছে, যার সাথেই দেখা হচ্ছে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। তার সঙ্গে যন্ত্রণা তো আছেই।

                    

                   কিন্তু আমার ভাবনায় ছিলো শুধু দিদির কথা। বিধানসভা ভোটের প্রচারের শুরুতেই পায়ে চোট লেগে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি হলেন। আমরা সকলেই চিন্তায় পড়লাম। কয়েকদিনের মধ্যে বেরিয়ে পড়লেন হুইলচেয়ারে। ভাঙ্গা পায়ে প্লাস্টার অবস্থায় খেলা হবে স্লোগান তুললেন। বাকিটা ইতিহাস। আমার সে তুলনায় কিছুই হয়নি। আমি কেন পারবো না এই তিনদিন কাজ করতে। মনের জোরে বেরিয়ে পড়লাম।

২৮ জুলাই:-

                   

                   সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়ের বাড়িতে অন্যান্য সাংসদদের সাথে দিদির দেখা, দুপুরের আহার। তারপর দিল্লি প্রেসের সঙ্গে hi-tea.

                   

                  দেখলাম কোভিডের ভেতরে সব সাংসদরা দিদিকে কাছে পেয়ে আহ্লাদে আটখানা। দিদিও ওদের সাথে খুব মজা মশকরা করছিলেন। তার ভেতরেও “তুই এটা করবি, আপনি এটা করবেন” ইত্যাদি তো লেগেই আছে। সবার আবদারে সেলফি তুললেন। আমাকে দেখে সবাই দিদির পিছনে দাঁড়িয়ে ছবিও তোলালেন।

                         

                       একেই নড়তে পারছি না। তার মধ্যে এত সাংবাদিক। দিদি হাসিমুখে তাদের সাথে নানা কথা বলছিলেন। পায়ের ব্যাথা ভোগালেও এইসব দৃশ্য দেখে খুব ভালো লাগছিলো। 

                   

                         দোলা সেন তার মাকে নিয়ে হাজির হলেন। দেখলাম দিদি দ্রুত উঠে গিয়ে প্রণাম করলেন। মাসিমাও জড়িয়ে ধরে বললেন, “মমতা তুমি শরীরের দিকে নজর দাও। তোমাকে আমাদের দেশে অনেক দরকার। অনেক কাজ এখনো বাকি রয়েছে।”

                   

                    একটু বয়োজ্যেষ্ঠ হলেই দেখেছি দিদি সকলকেই প্রণাম করেন। এটা সত্যিই শেখার আছে। যা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই।

                      

                     ঢোকার সময় গেটে আটকিয়ে দিদির আঁচলে কালি লেগে যায় বেশ অনেকটা। সেখান থেকেই সনিয়া গান্ধীর বাড়ি যাওয়া। দিদি একটু উসখুস করছিলেন। দেখলাম সাংসদ মহুয়া মৈত্র স্যানিটাইজার, জল, ন্যাপকিন দিয়ে দিদির শাড়ির আঁচল পরিষ্কার করতে লাগলেন। তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন সাংসদ মিমি ও শতাব্দী।

                  

                    এটা দেখে অবাক হয়ে ভাবছিলাম, সত্যিই কে বলবে উনি তৃতীয়বারের মুখ্যমন্ত্রী। ভারতবর্ষের একমাত্র বিরোধী মুখ। এই দৃশ্য দেখার আমার সৌভাগ্য হয়েছিল। মনে হল পুরোটাই বাড়ির কোন অনুষ্ঠান। প্রত্যেকে খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে মজা করলেন।

                     

                      কেউ কেউ ছোট ছোট উপহারও দিলেন। যেমন- কাকলি শাল, ডেরেক ও সুদীপ ফুলের তোড়া, দোলা সেন মাস্ক। এ এক অসাধারণ দৃশ্য। অভিষেক ঘুরে ঘুরে সকলের সাথে বার্তালাপ করলেন।

                          

                     এরপরই ছিল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের পালা। সবাই এলেন এক এক করে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চ্যানেলে বিখ্যাত সাংবাদিকরা তো এসেছেনই, এমনকি তাদের মালিক বসেরাও আছেন।

                   

                        প্রত্যেকে দিদির সাথে নমস্কার করে নিজেদের পরিচয় দিয়ে নানা প্রশ্ন করলেন। দিদি ঠান্ডা মাথায় সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন। বেশিরভাগ প্রশ্ন ছিল বিজেপি বিরোধী প্রধান মুখ কি তবে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হবে।

                     

                       সেদিন একটা প্রশ্ন ছিলো, “বাংলা নিজের মেয়েকে চায়” – এই শ্লোগান দিয়ে বাংলায় ধরাশায়ী করেছেন ভারতীয় জনতা পার্টি কে। তবে কি চব্বিশেও ঠিক এইরকম ভাবছেন?

                         দিদি উত্তর দিলেন, “এসব মানুষকে ভাবতে দিন। মানুষ আমাদের পাশে আছে। Country will decide who face it. তাছাড়া চব্বিশ এখনো অনেকদূর। শিশু তো জন্মালোই না, আমরা কি তার আগেই কিকরে নাম ঠিক করে ফেলি ? মূলকথা বিজেপিকে হারাতে হবে। আপনাদের ওপরেও পেগাসাস সহ অনেক কিছু হচ্ছে। দৈনিক ভাস্করকে যেভাবে হেনস্থা করা হলো।আপনারা নিজেরা ভাবুন এই সরকারকে থাকতে দেবেন কিনা।”

                                      প্রেস কনফারেন্স চলাকালীনই সবার আগে আমি ১০নং জনপথ রোডের বাড়িতে চলে যাই। যে বাড়িতে সনিয়া ও রাহুল থাকেন। দেখলাম প্রায় ৫০০ ওপরে সাংবাদিক গেটের সামনে পজিশন নিয়েছেন। কোনরকমে ঠেলেঠুলে সিকিউরিটিকে নিজের পরিচয় দিতেই ওদের একজন আমায় রিসেপশনে বসালেন।                    

                     এবাড়িতে আগেও দু’বার এসেছি। বাড়ির রাস্তাঘাট তাই অনেকটা পরিচিত। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাহুলের সেক্রেটারি ও ফটোগ্রাফার এসে হাজির। আমাকে পরীক্ষা করে সনিয়ার লাগোয়া ঘরে নিয়ে গেলেন। এই ঘরেই ইন্দিরা গান্ধী ,মৌলানা আজাদ, ও রাজীব গান্ধীর ছবি দেখলাম।                   

                    দেশপ্রিয় পার্কের রাজীব গান্ধীর মিটিং এ হাসি মুখের ছবিটা বাংলার ফটোগ্রাফার ভাস্কর পাল এর তোলা। ভাস্কর খুব অল্প বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ভাস্করের সাথে রাজিবের সম্পর্ক সেই সময় আমাদের অনেক ফটোগ্রাফারদের মনে একটা প্রফেশনাল জেলাস ফিল করাতো।                     

                 কিছুক্ষণের মধ্যেই দিদি হাজির। হাতে সুন্দর কাজ করা উত্তরীয়। টিপটিপ বৃষ্টিতে সনিয়া বেরোলেন না। ছোটঘর থেকে নমস্কার করতেই দিদি উত্তরীয় পরিয়ে দিলেন। এক মিনিট সনিয়া ও দিদি আমাদের পোজ দিয়ে ঘরে ঢুকলেন।                     

                    ঢোকার সময় সনিয়াজি  আগে ঢোকার ইশারা করতেই দিদি অনেকটা ঝুকে সনিয়াজিকে আগে যেতে বললেন। মিটিং এর শুরুতে শুনলাম ভেতরে রাহুল ও আছে। ততক্ষণে নিউজ18এর বিশ্ব ও মিডিয়া সেলের পুন্নিও এসে হাজির। ময়ূরের ডাক ছাড়া সবাই চুপচাপ। স্পেশাল পুলিশও কোথাও নেই। রাহুলের ছোট্ট কুকুরকে নিয়ে একজনকে ঘুরতে দেখলাম।                        

                    যথাসময় দিদি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। দরজায় রাহুল সনিয়া দাঁড়িয়ে। 

                      তারপরই দিল্লির ৫০০ জনের ওপরে সাংবাদিকদের প্রশ্নবান শুরু হলো। সনিয়া ও রাহুল গান্ধীর সাথে দিদির ছবি সব কাগজ টিভি এজেন্সিকে দিদির নির্দেশে রিলিজ করলাম। এরকম ছবির জন্যই তো আমরা সাংবাদিকরা অপেক্ষায় থাকি। আমি ধন্য দিদির সাথে থাকার ফলে এ সুযোগ আমার কাছেও চলে আসে।

                      ফিরে এলাম সাউথ এ্যাভেনিউ। দিল্লি মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিদির কাছে এলেন। আমিতো দিদিকে দেখে অবাক। বাড়িতে মা দিদিরা যেভাবে শাড়ি পড়ে থাকে, ঠিক সেইভাবেই পড়ে আছেন, চুলটা ঘরোয়াভাবে বাঁধা। এইভাবেই দিদি বেরিয়ে এলেন। দুজনকে দেখেই আমার মনে হচ্ছিল বিজেপির বিরুদ্ধে বিজয়রথের দুই মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

                          ফিরলাম বঙ্গভবন। কাঁধে ক্যামেরা থাকলে ব্যথার কথা মনে হয়না। কাজ শেষ হলে বুঝতে পারি হাঁটুর কি যন্ত্রণা নিয়ে আমি কাজ করে যাচ্ছি। 

২৯ জুলাই:              

                     ভাবছি আর দুটো রাত কাটালেই বাড়ি। পারবো তো? বিশ্বাস করুন ভয়ে রাস্তায় এবং ফুটপাতে যত গরিব মানুষ দেখেছি ১০-২০ এমনকি খুচরো না থাকলে ৫০ টাকা অবধি দেওয়া শুরু করলাম। মনে মনে ভাবলাম এই মানুষরাই আমাকে বাঁচাবে এই দুদিন। ধর্মস্থানে গিয়ে হাত জোড় করে প্রণামী দেওয়া আমার ঠিকুজিতে নেই। আমি মানুষে বিশ্বাসী। তারাই আমার কষ্ট দুঃখ দূর করবে।                    

                  বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে সোজা গড়করির বাড়িতে চলে যাই। মেনগেট পেরিয়ে যেতেই স্পেশাল পুলিশ তল্লাশি করে আমায় বসার ঘর গোল্ডেন রুমে নিয়ে গেলো।

                                     প্রথমে জল তারপরে পাঞ্জাবি স্টাইলে দুধ চা আসে। বাড়ির ভেতরে চড়ুই পাখির মত উড়ে বেড়াচ্ছে সাথে তাদের ছানাপোনা। কিছুক্ষণ পর দিদির গাড়ি এলো। গড়করি বেরিয়ে এলেন। দিদি হলুদ গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন।                                 আমি ছবি তোলার জন্য মাস্ক খুলতে অনুরোধ করলাম। একটু খুলেই পরক্ষণেই দুজনে পড়ে নিলেন। আসলে কিছুদিন আগেই নীতিন গড়করির কোভিড হয়েছিল।                

                  মিটিং এর মধ্যেই ডাক পড়লো। হাইরোড নিয়ে তখন আলোচনা হচ্ছিলো। ছবি তুলে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, দিদি চোখের ইশারায় বেরিয়ে যেতে বললেন।

                                      ওখান থেকে বেরিয়ে আবারো দিল্লির সব সাংবাদিকদের মুখোমুখি। দিদি গাড়ির কাচ নামিয়ে বললেন সাউথ এভেনিউ চলে এসো। এখানে কিছু বলবো না। দিদির একটাই কথা সবাইকে এক হতে হবে। মানুষ পথ দেখাবে।                                  কিছুক্ষনের মধ্যেই ডিএমকে নেত্রী সংসদ কানিমোঝি এলেন দেখা করতে, একটা বইও উত্তরীয় দিলেন। তারপর এলেন জাভেদ আখতার শাবানা আজমি। বামপন্থী ধারণার মানুষ। নতুন করে আর কি পরিচয় দেবো।                     

                    বৃষ্টির ভেতরে শাবানা যেভাবে জড়িয়ে ধরলেন দিদিকে, ও কথা বলতে লাগলেন। জাভেদ আখতার “আরে ছোড়িয়ে ছোড়িয়ে” না বললে হয়তো আরো কতক্ষণ দিদিকে জড়িয়ে ধরেই কথা বলতেন। দিদি অনেকটা ঝুকে জাভেদ আখতারকে প্রণাম করলেন।                     

                     দিদির যে একটা শায়েরীর বই আছে, তা শুনে জাভেদ অবাক হলেন। শাবানা হাত জোড় করেই বেশিরভাগ কথা বললেন। ওর হাসি দেখে পুরনো বহু ছবির কথা মনে পড়ছিল।                                দিদি ঘরে এবং প্রেসের সামনে জাভেদকে অনুরোধ করলেন খেলা হবে নিয়ে একটা গান লেখার।এটাই আমাদের দিদি যা কিছু মনে আসে কোনরকম জড়তা ছাড়াই বলে দেন। আমরা অপেক্ষায় সেই গানের জন্য।

৩o জুলাই:             

                     দিদি ফেরার আগে সাউথ এভিনিউয়ের বাইরে অপেক্ষারত সাংবাদিকদের কিছু কথা বললেন। সাথে এটাও বললেন, “দুমাস পর আবার আসবো।”                  

                   দিদি বেরিয়ে যেতে আমি সদ্য প্রয়াত চিত্রসাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকীর সাথে দেখা করতে জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটির দিকে রওনা দিলাম।                 

                    আগে থেকে একটা গোলাপের তোড়া সিংজিকে দিয়ে আনিয়ে রেখেছিলাম। জীবিত অবস্থায় ওর সাথে পরিচয় না থাকলেও চিরঘুমের দেশে যাওয়া দানিশকে একবার আমি দেখতে যাচ্ছি। খুব আনন্দ হচ্ছিল। বয়সে ছোট হলেও এভাবে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ কতজনের আসে। রওনা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমুল বৃষ্টি নামলো।                    

                      সিংজী বললেন, “স্যার আপনি যেতে পারবেন না। ওটা নিচু জায়গা। কোমর সমান জল জমে যায়।” আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর দেখলাম চারিদিক অন্ধকার করে এলো। সত্যিই জল জমে গেল।                     

                   অগত্যা বঙ্গভবন ফিরলাম। মনে মনে বললাম দুমাস পর যখন আসবো, তখন দেখতে যাবো। গোলাপের তোড়াটা গাড়িতেই পড়ে রইলো। 

                      ৩১ জুলাই সকালবেলা রোদ উঠেছিল। খুব ভালো লাগছিলো। কদিন তুমুল বৃষ্টিতে ভেজা গাছগুলো রোদ পড়তেই ঝলমল করছিলো। দিদির সাথে বৃষ্টির একটা সম্পর্ক আছে। আমরা তা জানি।

                      ২৬ জুলাই থেকে ৩১ জুলাইয়ের এই কটা দিন ঝড়ের মত আমি এই খোঁড়া পায়ে খেললাম। চব্বিশে ভারতের কোটি কোটি লোক মোদির বিরুদ্ধে খেলতে নামবে। তা এই দিল্লী সফর থেকেই শুরু হয়ে গেলো। আমি সামান্য মানুষ হয়ে অল্প চোট লাগা পায়ে খেলা শুরু করার আনন্দ নিলাম।

                    অতিবাম রাজনৈতিক আদর্শের মানুষ আমি। দিদিও তা জানে। কিন্তু গত চার দশকে আমি আমার মাতৃসমা ওই মানুষটিকে যেভাবে আমি দেখেছি তা ঠিকঠাক ভাষায় বর্ণনা করা আমার পক্ষে অসম্ভব। ওনার ডেডিকেশন, ওনার কাজ, ওনার মানুষের জন্য ভাবনাগুলো, আমি আমার আদর্শের প্রতিমূর্তি দিদির মধ্যে দেখেছি। আজকে অনেকেই ওনাকে প্রকৃত বামপন্থী বলছেন, কিন্তু আমি বহুবছর আগে থেকেই বুঝেছিলাম দিদিই পারবেন সমাজকে আলো দেখাতে। আজ দেখি আমার ভাবনায় ভুল ছিলো না।

                  একজন সাংবাদিক হিসেবে যে ঘটনা, মানুষ ও সময়ের সাক্ষী হতে পারছি তা আমরা যারা সাংবাদিক, তারা এইসব মুহুর্তগুলিই কাজের ক্ষেত্রে খুঁজি। আমাকে এই সুযোগ দেবার জন্য দিদিকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার নেই।

                     চব্বিশে কি হবে, কি হবে না, তা জানিনা। আমি জ্যোতিষ নই। আর এটা দিল্লী। শাহী ঘরানার রাজনীতি এখানে জটিল আবর্তে ঘুরপাক খায়। যাকে সহজ অংকে ধরাটাই যথেষ্ট কাওকে ধরাশায়ী করতে। কিন্তু আমি মন থেকে চাই, দিদি প্রধানমন্ত্রী হোন। কারণ গোটা সফরজুড়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় ও জ্যোতি বসুর পর দিল্লীর রাজনীতিতে আবার একজন বাঙালীর উজ্জ্বলতর উপস্থিতি দেখে বাঙালি হিসেবে গর্বিত আমি।

                                    এখন এটাই দেখার যে, তখত এ দিল্লী দিদিকে কিভাবে নেয়।

জয় বাংলা।।

জয় হিন্দ।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here