টুডে নিউজ সার্ভিস, বর্ধমানঃ বর্ধমান আদালতের আইনজীবীদের হুমকি চিঠি পেয়েই রাতারাতি মহিলা আইনজীবীকে মারধরের ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করল পুলিশ। ধৃত যুবকের নাম রোহিত দাস ওরফে রাজীব। বাড়ি শক্তিগড় থানার গাংপুর দীঘিরপার এলাকায়। পেশায় একটি ফুড ডেলিভার সংস্থার ডেলিভারী বয়। বর্ধমান বার এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আইনজীবী অরূপ দাস জানিয়েছেন, পুলিশের চোখে ধুলো দিতে ঘটনার দিনই রাতারাতি মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছিল রোহিত। যদিও অমানবিক এই ঘটনার ও একইসাথে পুলিশী অসহযোগিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে মঙ্গলবারের ঘোষণামতই বুধবার কর্মবিরতিতে সামিল হয়েছে বর্ধমান বার অ্যাসোসিয়েশন। ধৃত রোহিত দাসের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৭৪, ৮৯, ১১৫(২), ১১৭(২), ১২৬(২) ও ৩৫১(৩) নং ধারায় যথাক্রমে শ্লীলতাহানী, মারধরের ফলে মহিলার গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট হওয়া, স্বেচ্ছায় আঘাত করা, স্বেচ্ছায় গুরুতর আঘাত করা, স্বেচ্ছায় কারও ন্যায্য অধিকারে হস্তক্ষেপ ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে মামলা রুজু করে বুধবার তাকে বর্ধমান আদালতে পেশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মহিলা আইনজীবীকে মারধর, মারধরের জেরে তার গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট হওয়া ও থানায় গেলে দীর্ঘক্ষন বসিয়ে রাখার পরও অভিযোগ লিপিবদ্ধ না করার প্রতিবাদে বুধবার কর্মবিরতি পালনের সিদ্ধান্ত নেয় বর্ধমান বার অ্যাসোসিয়েশন। মহিলা আইনজীবীর অভিযোগ, ঘটনার পরে তিনি রক্তাক্ত হলেও বর্ধমান হাসপাতালে ভর্তি হতে গেলে পুলিশে অভিযোগ অথবা ফোনে পুলিশকে জানাতে হবে বলে জানানো হয়। বাধ্য হয়ে তিনি বেসরকারী চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা করান। আবার বর্ধমান থানাও অভিযোগ না নেওয়ার পাশাপাশি অসহযোগিতা করে। বাধ্য হয়ে তিনি মঙ্গলবার বর্ধমান বার অ্যাসোসিয়েশন-কে চিঠি দিয়ে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা সমূহ বিস্তারিতভাবে জানান।
ওই চিঠি পাওয়ার পরেই বর্ধমান বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সদন তা পূর্ব বর্ধমানের পুলিশ সুপার, বার কাউন্সিল, জেলা জজ-সহ বিভিন্ন জায়গায় চিঠি দিয়ে দ্রুত অভিযুক্তকে চিহ্নিত করে গ্রেফতারের দাবি জানান। পুলিশের অসহযোগিতার প্রতিবাদে ও দোষীকে গ্রেফতারের দাবিতে বুধবার বর্ধমান বার অ্যাসোসিয়েশন কর্মবিরতির ডাক দেয়।
পুলিশ সুপার সায়ক দাস জানিয়েছেন, খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঐ মহিলা আইনজীবী অভিযোগ, শনিবার বর্ধমানের দোলের দিন বিবি ঘোষ রোড ধরে তিনি আর তাঁর স্বামী মোটরবাইকে যাচ্ছিলেন। একটি বাইক তাদের ধাক্কা মারে। এরপরই হঠাৎ করে একটি পুলিশ স্টীকার সাঁটানো বাইক তাঁদের সামনে দাঁড়ায় এবং নিজেকে বর্ধমান থানার “পুলিশ” পরিচয় দিয়ে আচমকা তাঁকে রাস্তায় ফেলে পেটে লাথি মারে। এমনকি লোক জোগাড় করে তাদের উপর ফের হামলা চালানোর হুমকি দেয়। শুধু তাই নয়। এরপর থানায় গেলেও তাকে দীর্ঘক্ষন থানায় বসিয়ে রাখা হয় এবং দুর্ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ। বার অ্যাসোসিয়েশনকে দেওয়া চিঠিতে আইনজীবীর আরও অভিযোগ, ওই অবস্থাতে তাঁরা বর্ধমান থানায় গিয়েছিলেন। থানা থেকে জানানো হয়, চিকিৎসা করার পরে অভিযোগ করবেন। সেই মতো বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে তাঁরা যান। কিন্তু সেখান থেকে বলা হয়, থানায় রিপোর্ট অথবা ফোনে না বললে তাকে ভর্তিও নেওয়া হবে না। এরপর তিনি ফের বর্ধমান থানায় গিয়ে একটা লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগ, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর পুলিশ অভিযোগ নিলেও কোনও প্রকার রিসিভ কপি দেয়নি। বর্ধমান মেডিক্যালের প্রিন্সিপাল মৌসুমি বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন আমরা খতিয়ে দেখে বিষয়টি বলতে পারবো। যদিও বর্ধমান বার অ্যাসোশিয়েসনের সম্পাদক সদন তা জানিয়েছেন, পুলিশ তৎপরতার সাথে গ্রেপ্তার করায় আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। তবে তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশ কি কি পদক্ষেপ নিচ্ছে তা আমরা লক্ষ্য রাখবো। একইসঙ্গে পুলিশের এই আচরণ এবং বর্ধমান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে তাঁরা যেমন তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছেন, তেমনি পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও তাঁরা আইনানুগ পথেই এগোবেন। সদন তা জানিয়েছেন, একজন রক্তাক্ত আইনজীবী অভিযোগ জানাতে গেলেও যদি তাঁর অভিযোগ না নেওয়া হয় তাহলে সাধারণ মানুষের কি পরিণতি তাঁরা বুঝতে পারছেন। গোটা বিষয়টি তাঁরা বিচারকের সামনে তুলে ধরবেন। উল্লেখ্য, মহিলা আইনজীবীক মারধরের ঘটনায় ধৃতের পক্ষে এদিন কোনো আইনজীবীই দাঁড়াননি। এব্যাপারে সদন তা জানিয়েছেন, তাঁরা কাউকে নিষেধ করেননি। তবে সহকর্মী আক্রান্ত হওয়ায় মানবিক কারণ কেউ না দাঁড়ালে তাঁরা কিছু করতে পারেন না। আইনজীবী অরূপ দাস জানিয়েছেন, এদিন ধৃতকে সিজেএম আদালতে ৩ দিনের পুলিশী হেফাজতের আবেদন জানিয়ে পেশ করা হয়েছিল। ভারপ্রাপ্ত সিজেএম ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী ৩দিনের পুলিশ হেফাজত মঞ্জুর করেছেন। ঘটনায় জড়িত ধৃতের বাকি সঙ্গীদের হদিশ পেতে পুলিশ কি ব্যবস্থা নেয় তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন তাঁরা। তারপরেই তাঁরা ফের বৈঠকে বসে পরবর্তী কর্মসূচী নেবেন। উল্লেখ্য, ধৃত রোহিত দাসের দাদা উলুবেড়িয়ায় পুলিশে কর্মরত।
