শর্মিষ্ঠা সিনহাঃ ‘শনিবারের ছড়া’। ২০১৮-র সেপ্টেম্বর থেকে ২০২০-র আগস্ট ফেসবুকে আপলোড করা প্রবীর ঘোষ রায়-এর ১০২টি ছড়া এবং ‘শেষ পাতে’-র ৯টি ও শেষ মলাটের আরো ১টি, মোট ১১২টি ছড়া নিয়ে এই গ্রন্থটি সংকলিত হয়েছে। লক্ষণীয় যে ছড়াকার প্রতিটি ছড়ার আলাদা আলাদা ভাবে নামকরণ করেননি বরং ‘শনিবারের ছড়া-১’, ‘শনিবারের ছড়া-২’ এইভাবে… ছড়াগুলি চিহ্নিত। ছড়ার বইটিতে উপরিপাওনা যে কোনো ছড়ার পরিপ্রেক্ষিত কি, উপপাদ্য বিষয় কি তা ছড়া শুরুর আগেই ২-৩-৪ লাইনে ছড়াকার নিজেই বলে দিয়েছেন যা সাধারণ পাঠককে ছড়াটি বুঝতে সুবিধা করে দিয়েছে। বিগত কয়েক বছরে আমাদের ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া নানা সামাজিক অবক্ষয় ও সাংস্কৃতিক ভাঙন তাঁর ছড়ার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। যে ঘটনাগুলি আমরা আমাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক পত্রিকাতে পেয়েছি, কোথাও সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা ও সংঘর্ষ, ধর্মান্ধতার নির্মম অত্যাচার, গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ, দলিতের আর্তনাদ, দায়িত্বশীলপদে বসে থাকা ব্যক্তিত্বের কাণ্ডজ্ঞানহীন বাক্য – সমস্ত কিছুকেই কষাঘাত করেছেন কবি। মাতৃত্বের লাঞ্ছনা, মিথ্যে মামলা চাপিয়ে নিরপরাধকে জেলে পোড়া, মনুষ্যত্বের চরম অবমাননা তাঁর কলমের নজর এড়ায়নি, নজর এড়ায়নি করোনাতঙ্ক এবং গোময়, গোমূত্র নিয়ে রাজনীতিবিদদের উদ্ভট তত্ত্ব। ব্যঙ্গ বিদ্রূপে উপযুক্ত জবাব দিতে ছাড়েননি। শাসকের রাঙা চোখের চাহনিকে ভয় পাননি। বরং সাহসিকতা ও বুকের জোরে দম রখেছেন। বুলন্দশহরের নৃসংশ ঘটনা, ছদ্ম-জাতীয়তাবাদের পৈশাচিকতা, পুলওমায় সেনাদের রক্তাক্ত লাশে আমরা মর্মাহত, স্তম্ভিত। ইতিহাস যাদের ক্ষমা করবে না কোনোদিন, তাদের জন্য ছড়াকারের কন্ঠে গর্জে উঠেছে— ‘যুবসমাজ ছাত্রসমাজ জেগে আছে, স্বৈরাচারী নিপাত যাও’।  বিগত কিছু সময় ধরে ঘটে যাওয়া সমাজের বীভৎস গভীর ক্ষতগুলির ওপর তিনি আলোকপাত করেছেন, রূঢ় বিদ্রূপে। বিশ্ব যখন মৃত্যু উপত্যকা করোনা বিধ্বংসী ছোবলে, মহামারীর বিষ প্লাবনের এই ভয়ংকর গ্রাসের স্বরূপটি তথা লকডাউন এবং তার ফলে পরিযায়ী শ্রমিকের করুণ অসহায়তা সবই উঠে এসেছে ছড়াকারের লেখনীতে। ছড়াকার উদ্বিগ্ন, ‘কে বেশি ভয়ংকর? রোগ না ক্ষুধা? কী বেশি দরকারী? ধর্ম না বিজ্ঞান? করোনার দিনগুলি কোন পথ দেখাবে শেষ পর্যন্ত? প্রেম না ঘৃণার!’ করোনাকালে লকডাউনে মানুষকে ঘরে আবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। কিন্তু যার ঘর নেই, ফুটপাতে যার রাত্রি কাটে খোলা আকাশতলে, কার্ফুতে বন্ধ  দিন-আনা দিন খাওয়া মানুষের রুজি – তাদের পেটে আগুন জ্বলছে। যে কৃষক সব্জি ফলায় মাঠে, ইস্টিশানে মোট তোলে যে কুলি, ভ্যান ঠ্যালে যে, রিক্সা চালায়, চা-দোকানের ঝাঁপ খোলে, বারবাণিতাদের অন্ধ জগত, সবার কথাই ভাবছেন কবি, মহামারীর শিকার এই সব মানুষের জন্য মহান রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই, সেবকেরা নির্বিকার। ছড়াকার বলেছেন বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে হবে তফাৎ ভালো মন্দে। 

গরীব ব’লে কবির কথা বাসি হ’লেই ফলে,

ছদ্মবেশী ঘরভেদী সব বাড়ছে দলে দলে।

করোনার কালে সর্বজ্ঞদেরও যে অসহায় দেখাচ্ছে ৮৫ নং ছড়াটি তার উদাহরণ। যারা নিজেদেরকে শিক্ষা দীক্ষার মাপকাঠিতে বিজ্ঞ বলে জানতো তারাও আজ দুর্গতদের মতো কেমন বোকাবাক্সের ভূত!

দেশটা যখন পুরোপুরি ‘আবোলতাবোলের প্রত্যক্ষ ভূমি’তে পরিণত হয়েছে, আমাদের সকলের  কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা, ছড়াকার প্রকৃতির নিষ্ঠুরতাকেও তুলে ধরেছেন, ‘যখন বাতাস ভরে উঠেছে চেনা অচেনা বিষে’, ‘বিজ্ঞেরা বাঁকা হেসে বলেন ক্লিশে’, তখন ছড়াকার প্রবীর ঘোষ রায়ের প্রত্যয়—

আসবে সে দিন, মানবতার সব অপমান

ঘুচিয়ে যখন সবাই হবে সবার সমান।

চলতে পথে হাত ধরেছি, বন্ধু সবাই,

ক্ষুধার, মারীর সব অবরোধ পার হয়ে যাই।

পাশাপাশি তাঁর কবিতায় আরো একটি শান্ত স্রোতধারা বয়ে গেছে; যা কিছু কল্যাণকর, শুভ সুন্দর তার জয়গান গেয়েছেন ছড়ায় ছড়ায়। ৩৪ নং ছড়াতে বউয়ের সঙ্গে খুনসুটি, প্রেম, দাম্পত্য-কলহ আর পরকীয়া নিয়ে মজার রসাস্বাদন, আবার ৭৮ নং-য়ে ধরা পড়ে কবি প্রেমের অভিমান –

‘আসবো বলেই যাওয়া আমার, যাবো বলেই আসা,

তুমি যাকে রাগ জানো তা আসলে ভালোবাসা।

………………………………………………………………

যাবো বলেই আসা আমার, আসবো বলেই যাওয়া

যাকে তুমি শূন্য জানো, সে আমার সকল পাওয়া।

ঠিক আর রাজনৈতিক ভাবে ঠিক এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝাতে ছড়াকারের বিচক্ষণতাও যথেষ্ট সুদৃঢ়।  মিথ্যার বেসাতি যারা করে মঞ্চের পিছনে তাদের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত থাকে, সে সর্তক বাণীও গর্জে উঠেছে তাঁর কণ্ঠে। রাজনীতি বড়ো আজব জিনিস, ছড়াকার সংশয়ে দ্বিধাগ্রস্ত — নীতিহীনতাই রাজনীতির মূল কিনা !  স্বার্থের কারণে কে কখন কার সঙ্গে হাত মেলায়, শত্রু-মিত্র বদলে যায়, তাকেও কটাক্ষ করেছেন তিনি— “আরে বাবা জানিরে, তোর হাতে ক্ষমতা,/ তা ব’লে কি থাকবে না প্রাণে কোনো মমতা!”

আবার ইছামতির জল – মাঝিমল্লাদের গান – পাখিদের আনচান – শরতের সুন্দর চিত্র পাঠকের মনকে ভরিয়ে তোলে। শরতের আকাশে যে কালো মেঘের ভ্রূকুটি রয়েই যায় সেই অশুভের বিনাশ চেয়ে শারদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কবি। নির্বোধের কর্মকাণ্ড, বাঘের গলায় মালা পরানো ও তার ভয়ঙ্কর পরিণতি অন্যদিকে ভূতের অস্তিত্ব ও কাণ্ড-কারখান নিয়ে মস্করা করতে তিনি ছাড়েননি। প্রকৃতির দুর্যোগের কাছে মানুষ বড়ো বিপন্ন, অসহায়! ধনী গরিবের বিভেদ রেখার তা ধার ধারে না, সে বক্তব্যই স্পষ্ট করেছেন ৮৮ সংখ্যক ছড়ায়। নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা— এই প্রবাদ বাক্যটি সত্য হয়ে উঠেছে ছড়াকারের ৮৭ নং ছড়ায়।

‘জীবনের গান গাইতে জানে না মৃ্ত্যুর পালাকার।’ এই মৃত্যু-উপত্যকাই আজ কবির স্বদেশ! তাই ভীষণ বিদ্রূপ করেছেন— ‘পাথর নিংড়ে রস চায় ওরা, ছেড়ে টসটসে ফল’। (৮৬)

আবার সমাজমাধ্যমের কুফল – বন্ধুত্বের বিজ্ঞাপন, মানুষের একাকীত্বের নিঃসঙ্গতার অবসাদের সুযোগ নিয়ে রঙিন স্বপ্নের হাতছানি— ফাঁদে পড়ে ন্যক্কারজনক পরিস্থিতির শিকার, বিপন্নতার আবহ, ঘুণ ধরা সমাজের পৈশাচিক বর্বরতা শিশু চুরির ঘটনা। চোরে চোরে মাসতুতো ভাইদের নিয়ে ঠাট্টাও করেছেন—

তোকে দেখে হাসি পায়, আমি তো জোকার,

দুনিয়ায় চলে রাজ যতেক বোকার।

তুই খাস চেটেপুটে, আমি খাই লুটে,

তুই খুব হিংসুটে আমিও কুচুটে।

আরো ভিন্ন ভিন্ন সুরে কিছু কিছু ছড়া স্থান পেয়েছে যা এক একটা এক এক স্বাদের। যেমন কবি নিয়ত খুঁজে চলেছেন তাঁর স্বদেশ, কিন্তু ‘যে মানুষের কোন স্বদেশ নেই,/ কোথায় পাবে সে তার পরিচয়/ …… /এপারে মন, শরীর চলে যাচ্ছে ওপারে,/ মায়ের ভিটে টুকরো করে কাঁটাতারের বেড়া,/ রিক্ত জীবন আগুন জ্বেলে রাখতে যদি পারে,/ একদিন ঠিক মানুষের পাশে দাঁড়াবেই মানুষেরা”— সম্প্রতি NRC NPR নিয়ে রাষ্ট্র তথা শাসকদের বজ্রনির্ঘোষে দেশ-ছাড়া হওয়ার ভয় এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে কাজ করে বেড়াচ্ছে। ছড়াকার স্পষ্টতই সে দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ভায়ের উঠোন যখন ভায়ের জমা লাশে ভরে ওঠে তখন একজন সত্যান্বেষীই-তো উপলব্ধি করতে পারেন— ‘শাসকের বেশে পরিচয় ঢেকে ঘাতকেরা পথ চলে।’ (৪৮) শাসক শক্তি গণতন্ত্রকে হত্যা করছে সেনার হাতে অস্ত্র তুলে, যে শাসক তাদের মেনিফেস্টোর সবার শেষে স্থান দেয় শিক্ষা-অন্ন-বস্ত্র তারা যে উন্নয়নের কোনো জোয়ার-ই আনতে পারে না, তার বিলিষ্ঠ উচ্চারণ তার ছড়ার পংক্তিতে পংক্তিতে। 

মৃত্যু উপত্যকাই কবির আজকের ভারতবর্ষ, তবু কেউ জানতে চাইলে ছড়াকার বলেন “ভালো আছি”! তবু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কবি গণতন্ত্রের আশু জয় চান। সবশেষে ঐতিহাসিক কৃষক-বিদ্রোহের প্রেক্ষিতে শাসকের রক্তচক্ষুকে ভয় না পেয়ে দামাল কবি শাসককে হুঁশিয়ারি দিয়ে সতর্ক করেছেন—

ভুলোনা শাসক, জওয়ান কিন্তু—

চাষির ঘরের-ই ছেলে।

কী হবে হঠাৎ তোমার দিকেই—

নিশানাটা ঘুরে গেলে!

সংকলনের কথা-মুখে ইমানুল হক বলেছেন, “আমাদের সময়কে ব্যাখ্যা করতে প্রবীর ঘোষ রায়ের কলম উদ্যত তীক্ষ্ণ তরবারি। ছন্দে ধ্বনিমাধুর্যে স্বর ও সুরযোজনায় ছড়াগুলি কালাতীতের মানোত্তীর্ণ”। এই বইয়ের আলোচনায় এই কথাগুলি তাৎপর্যবাহী।

বইটির একটি দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন সায়র ঘোষ রায়। 

দেশ প্রকাশন এই বইটি প্রকাশ করে সময়ের কাছে তাদের দায়বদ্ধতাই প্রকাশ করেছেন।

শনিবারের ছড়া

প্রবীর ঘোষ রায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here