সোনিয়া তাসনিম খানঃ  ১৯ জুলাই ২০২১ এ “উদার আকাশ” এর ভার্চুয়াল মঞ্চে পালিত হলো বাংলাদেশের জনন্দিত কথাসাহিত্যিক, হুমায়ুন আহমেদ-এর নবম মৃত্যু বার্ষিকী। দুই বাংলার কতিপয় সম্মানিত কবি, লেখক, সম্পাদক এবং সাংবাদিক মহোদয় এর উপস্থিতি এবং তাদের প্রাণবন্ত হুমায়ুন স্তুতিতে সন্ধ্যেটা হয়ে উঠেছিল হুমায়ুনময়। অনবদ্য এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন ওপার বাংলা থেকে “উদার আকাশ” পত্রিকার সম্পাদক ফারুক আহমেদ। প্রয়াত লেখকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি তাঁর মূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপন করেন। পশ্চিমবঙ্গের  অত্যন্ত জনপ্রিয় এই পিয়ার রিভিউ রিসার্চ জার্নাল “উদার আকাশ”-এর উদ্যোগে সিরাজ- সুনীল- হুমায়ুন-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ২০১২ আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলাতে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল বলে, তিনি জানান। বিশিষ্ট লেখক এবং সাংবাদিক শান্তা মারিয়া তাঁর সংক্ষিপ্ত আলোচনা ফোয়ারায়, বাংলা সাহিত্য ও এদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে হুমায়ুন আহমেদের দক্ষতা ও অবদানকে অত্যন্ত চমৎকার ভাবে তুলে ধরেন। গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক, লেখকের এই দুটি ধারার মাঝে তিনি হুমায়ুন আহমেদকে ছোটগল্পকার হিসেবেই মূলতঃ এগিয়ে রাখেন। বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি ও লেখক রোকেয়া ইসলাম ও শ্রদ্ধেয় কবি কামরুল বাহার বারীর সাবলিল মন্তব্যে ভর করে উঠে আসে হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কিত নানা জানা-অজানা তথ্য। উল্লেখ্য, হুমায়ুন রচিত নব্বই দশকের জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল “কোথাও কেউ নেই” এর ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে এই সময়ে তাঁরা কিছুটা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। তাঁরা আরও জানান, এক সময় ডুবতে থাকা বাংলাদেশের বইশিল্প, প্রকাশনা শিল্প সহ চলচ্চিত্র শিল্পকে পুণরায় উজ্জীবিত করবার পেছনে হুমায়ুন আহমেদের জাদুকরী আখ্যানের কথা। হুমায়ুন আহমেদ রচিত কতিপয় উপন্যাসের ওপর ভাবগম্ভীর আলোকপাতও করেন তাঁরা। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন, লেখক সোনিয়া তাসনিম খান। তার প্রাঞ্জল বক্তব্যে উঠে আসে, তরুণ প্রজন্মকে কি করে বইমুখী করে তুলেছিলেন এই প্রিয় লেখক। সাথে প্রাণ খুলে ভালবাসতে শিখিয়েছেন অবারিত জোৎস্নাস্নাত রাত আর বর্ষাদিনের বৃষ্টিবিলাসকে। 

উল্লেখ্য, হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় বাংলা কথাসাহিত্যিকদের মাঝে তিনি অন্যতম। বাংলা সাহিত্যে তিনি সংলাপ প্রধাণ নতুন শৈলীর জনক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক। তাঁর সৃষ্ট হিমু, মিসির আলি ও শুভ্র চরিত্রগুলি বাংলাদেশের যুবক শ্রেণীকে ভীষণ ভাবে উদ্বেলিত করেছে। তাঁর টিভি নাটকগুলোর মাঝে “কোথাও কেউ নেই”, “এইসব দিনরাত্রি” বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ১৯৯৪ সালে তাঁর নির্মিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক “আগুনের পরশমণি” মুক্তি লাভ করে। যা পরবর্তীতে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সহ মোট আটটি পুরস্কার লাভ করে। এছাড়াও শ্যামল ছায়া ও ঘেটু পুত্র কমলা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের জন্য দাখিল করা হয়েছিল। ‘মধ্যাহ্ন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘মাতাল হাওয়া’ ইত্যাদি তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি প্রদত্ত ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। এছাড়াও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ এ ভূষিত করেন। 

জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোণা মহকুমার মোহন গঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। পিতা ফয়েজুর রহমান একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, শহীদ ফয়েজুর রহমান নিজেও একজন সাহিত্যানুরাগী ছিলেন৷ সমকালীন পত্রিকার তাঁর লেখা প্রকাশিত হত। এখানেই শেষ নয়। লেখক মাতা আয়েশা ফয়েজ এর রচিত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ “জীবন যে রকম” প্রকাশ পায় ২০০৮ সালে। যার অনবদ্য লেখন শৈলী লাখো পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছিল। লেখকের আরও দুই ভাই , মুহাম্মদ জাফর ইকবাল শাহাজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব রম্যলেখক ও কার্টুন ম্যাগাজিন “উম্মাদ” এর সম্পাদক। বলা যায়, সাহিত্যের প্রতি প্রেম ও ভালোবাসা লেখক তাঁর রক্তে ধারণ করেই জন্মেছিলেন। যার কারণে হয়ত, তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের অধ্যাপনা পেশার ইতি টেনে নিয়ে একটা সময়ে সার্বক্ষণিক সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন৷ ১৯ জুলাই ২০১২ সালে দুরারোগ্য ব্যাধি কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই শক্তিশালী লেখকের জীবনাবসান ঘটে। প্রকৃতপক্ষে, ভালোবাসার আরেক নাম, হুমায়ুন আহমেদ। যিনি তাঁর কলমের জাদুতে নিমিষেই মানুষকে আবেগী করে তুলেছেন আশ্চর্যজনক ভাবে। অতি সামান্য কোন বিষয় তাঁর কলমের ছোঁয়াতে লাভ করেছে অমরত্ব। সাধারণ কে নিমিষেই অসাধারণের ছাঁচে ঢেলে নেওয়া কালজয়ী এই কলম জাদুকর এভাবেই যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন বাউন্ডুলে হিমুর হলুদ রঙে, রূপার নীল ভালোবাসায়, শুভ্র-র উদাসীনতায় আর মিসির আলির যুক্তিগাঁথার মাঝে। 

পুরো একঘন্টা জুড়ে চলা এই অনুষ্ঠানটিতে স্পষ্টভাষী,  সদালাপী, কর্মপাগল এই প্রিয় লেখক সিক্ত হন সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। পরিশেষে, মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা ও তাঁর পরিবার পরিজনদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি সুঁতো টেনে নেওয়া হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here